বিপ্লবের প্রথম প্রহরে রাজনীতির ভাবনা


লিখেছেন, আরিফ আজাদ। বিপ্লবের প্রথম প্রহরে রাজনীতির ভাবনা নিবন্ধে আজ এমনকিছু কথা লিখতে বসেছি যা আমাদের অনেকের মনঃপূত হবে না। মনঃপূত না হলেও আমরা পারস্পরিক সম্মানের জায়গা থেকে দ্বিমত করবো—এটাই এই স্বাধীনতার সৌন্দর্য। কথা বলতে পারার জন্যই তো এই স্বাধীনতা।


শুরুতেই বলে রাখি, আমি একজন অরাজনৈতিক মানুষ। আমি কোনো দল করি না এবং কোনো দলের প্রতিনিধিত্বও করি না। তবে, মানুষ হিশেবে অরাজনৈতিক হলেও, আমি অত্যন্ত রাজনীতি সচেতন। সোশ্যাল মিডিয়াতে আমার লেখালেখি শুরু হয় রাজনৈতিক বিষয়াদি নিয়ে অ্যাক্টিভিজমের মাধ্যমে। ২০১২/২০১৩ সালের দিক থেকে যারা আমার লেখালেখির সাথে যুক্ত তারা জেনে থাকবেন সেটা। রাজনৈতিক সচেতনতার জায়গা থেকে তাই আজ কিছু কথা লিখে রাখতে চাই।


দেশের অনেক জায়গায় অনেক হামলা, ভাঙচুর আর ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে। এগুলো নিঃসন্দেহে গর্হিত কাজ আর আচরণ। কিন্তু বিপ্লব পরবর্তী সময়ে এই ধরণের ক্যাওয়াজ বেশ অবশ্যম্ভাবী। আটকানো যায় না কোনোভাবে। আমরা শ্রীলঙ্কায় দেখেছি। যারা মুক্তিযুদ্ধ দেখেছেন তারাও জানেন স্বাধীনতা পরবর্তী এই দেশে কীরকম অন্তর্কোন্দল আর হানাহানি, লুটতরাজ শুরু হয়েছিল। নব্বইয়ে স্বৈরাচার এরশাদের পতন পরবর্তী সময়েও সেটা দেখা গেছে। কিন্তু, এটা কেনো হয় জানেন? এটা হয় পাওয়ার ভ্যাকুয়ামের জন্য। ঠিক এই কারণে যতো দ্রুত অন্তবর্তীকালীন সরকার গঠন করে ফেলা যাবে, ততো দ্রুতই এর লাগাম টেনে ধরা যাবে। ততো দ্রুত সারাদেশে আইন এবং আইনি সংস্থা অ্যাক্টিভ করে ফেলা যাবে।


এখানে আরো কতোকগুলো বিষয়াদি আছে।


পাওয়ার ভ্যাকুয়ামের এই সময়টা একইসাথে ভাইটাল এবং ভোলাটাইল (গুরুত্বপূর্ণ এবং টালমাটাল)। কারণ, স্বৈরাচারের পতন হয়েছে ঠিক, কিন্তু তার সকল সফট পাওয়ারগুলো দেশে বিরাজমান আছে। তারা জোরেশোরে চেষ্টা চালাবে দেশে অরাজকতা আর নাশকতা সৃষ্টি করে এমন পরিস্থিতি তৈরি করতে যাতে এই বিপ্লব যারা করেছে দেশ বিদেশে তারা নাশকতাকারী বলে চিহ্নিত হয়। ফলে, শেখ হাসিনা যে এতোদিন বহির্বিশ্বকে বোঝাতো—সে না থাকলে দেশ মৌলবাদীদের খপ্পড়ে পড়ে ধ্বংস হবে, শেখ হাসিনার সেই দাবির পক্ষে প্রমাণ তৈরি হয়। সারাদেশে ঘটমান অরাজকতাগুলো যতোটা না পলিটিক্যালি মোটিভেটেড, তারচেয়ে বেশি এই ষড়যন্ত্রের অংশ বলেই আমার বিশ্বাস। আফটারঅল, ভারত যে এতো সহজে এই হার মেনে নিবে সেটা কল্পনা করাটা বোকামি।


সুতরাং, আমাদের প্রথম কাজ হলো এই সকল অরাজকতা, হানাহানি, মারামারি এবং ভাঙচুরগুলো থামানো। আর, যতো দ্রুত অন্তবর্তীকালীন সরকার আসবে, এটা ততো দ্রুত সহজ হবে। তাই, অন্তবর্তীকালীন সরকারই আমাদের মূল প্রায়োরিটি।


দ্বিতীয়ত, এই অন্তবর্তীকালীন সরকারের মেয়াদ কেমন হবে? বাজারে যে ৩ থেকে ৫ বছরের কথা শোনা যাচ্ছে, তা কি যুক্তিযুক্ত?


আমার মতে, অন্তবর্তীকালীন সরকার যদি ৩ বা ৫ বছরের জন্য হয়, সেটা একটা আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত হবে। মোটাদাগে এটা দেশের জন্য কল্যাণের হবে না।


কেনো হবে না ব্যাখ্যা করি।


দেশ পরিচালনার জন্য দরকার জনগনের ম্যান্ডেডে নির্বাচিত সরকার। নির্বাচিত সরকারের জন্য দরকার একটা ফ্রি এবং ফেয়ার ইলেকশান। অন্তবর্তীকালীন সরকার যতো স্বচ্ছ আর নিরপেক্ষই হোক, মনে রাখতে হবে তারা ভোটে জয়ী হয়ে আসা সরকার নয়। দেশের আপামর জনসাধারণের ইচ্ছার প্রতিফলন নয় এই সরকার।


অন্তবর্তীকালীন সরকার যেহেতু নির্বাচিত সরকার নয়, তাই দেশের প্রতিটা কোণের রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ তার পক্ষে অসম্ভব হবে। দেশের গ্রাম, ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা আর বিভাগে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা রাজনৈতিক বিভাজনের শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে পারে কেবলমাত্র সেই অঞ্চলের নির্বাচিত প্রতিনিধি। কিন্তু অন্তবর্তীকালীন সরকারের সেরকম প্রতিনিধি নেই এবং সেনাবাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মাধ্যমে গোটা দেশ নিয়ন্ত্রণ করতে গেলে শৃঙ্খলা তো আসবেই না, বরং ক্যাওয়াজ আরো বাড়বে। ১/১১ পরবর্তী সময়টা যারা দেখেছেন তারা জানেন এটার বাস্তবতা।


দ্বিতীয় আশংকা হলো, এই অন্তবর্তীকালীন সরকার যদি দীর্ঘ সময়ের জন্য আসে, সেই সুযোগটা পুরোদমে নিতে পারে আওয়ামিলীগ। মনে রাখতে হবে শেখ হাসিনা ও আওয়ামিলীগের সমস্ত সফট পাওয়ার এখনো বিদ্যমান। দেশের সমস্ত ইন্সটিটিউশানে তারা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে যদিও এখন বোল পাল্টেছে। তারউপর, ভারত ভীষণভাবে তোড়জোড় চালাবে শেখ হাসিনা বা আওয়ামিলীগকে রি-ফর্ম করতে।


অন্তবর্তীকালীন সরকার যেহেতু ভোটে নির্বাচিত সরকার নয়, তাই দেশের মধ্যে নানান ধরণের ঘটনা ঘটিয়ে তারা দেশকে অস্থিতিশীল করে রাখতে চাইবে। এই অস্থিতিশীলতায় ভুগতে ভুগতে জনগন ক্লান্ত হবে, বিরক্ত হবে, ক্ষতিগ্রস্ত হবে ব্যাপকভাবে। ভেঙে পড়বে রাষ্ট্রের সকল ফাংশনাল ইন্সটিটিউশান। একদা মানুষের মনে হবে—‘শেখ হাসিনাই তো ভালো ছিলো’ (ইতোমধ্যে এই বয়ান বাজারে চালু হয়ে গেছে)। একদিকে আওয়ামিলীগ ও হাসিনার প্রতি একটা সিম্প্যাথি তৈরি করা হবে, অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় ইন্সটিটিউশানে থাকা হাসিনার সফট পাওয়ারেরা ক্যু করে বসবে। ব্যস, পরেরদিন সকালে দেখতে পাবেন আওয়ামিলীগ আবার ক্ষমতায় এসে বসেছে।


আপনি বলতে পারেন—এবার শেখ হাসিনাকে যেভাবে তাড়ানো হয়েছে, সেই জনগন তো আর হাওয়া হয়ে যায়নি। সকলে আবার রাস্তায় নামবে। আপনাদের আবেগের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে বলি—দুই বা তিন বছর তো বহু দূরে, ৫ ই আগষ্ট যে স্বতঃস্ফূর্ততায় মানুষ রাস্তায় নেমে এসেছে, সেই মোমেন্টাম ইতোমধ্যেই অর্ধেক হয়ে গেছে। আন্দোলনকারীদের আরেকটা গনজমায়েতের ডাক দিয়ে পরীক্ষা করে দেখতে বলুন। ঠিক এজন্যেই বলে—লোহা গরম বা তাঁতানো অবস্থায় থাকতেই বারি দিতে হয়।


তৃতীয় আশঙ্কা হলো, শেখ হাসিনা সহ আওয়ামিলীগের সকল পলিসি মেকারেরা সেইফ এক্সিট পেয়েছে। এতো অত্যাচার, নির্যাতনের জন্য তাদের কি বিচার হওয়া উচিত ছিলো না? কিন্তু, কী উদ্দেশ্যে তাদেরকে সেইফ এক্সিট দেওয়া হলো? কারা দিলো তা তো আমরা দেখেছি—সেনাবাহিনী। শেখ হাসিনাকে সেইফ এক্সিট দেওয়া সেনাবাহিনীকে নিয়েই অন্তবর্তীকালীন সরকারের কাজকারবার হবে। যে সেনাবাহিনীর ওপর ভর করে আওয়ামিলীগের সকল পলিসি মেকারেরা নির্বিঘ্নে সরে যেতে পেরেছে, আমাদের কি এই আশঙ্কাও করা উচিত না যে—সেই সেনাবাহিনী খুব করে চাইবে হাসিনাকে পুনরায় ক্ষমতায় পুনর্বহাল করতে?


মোদ্দাকথা, আমার মনে হয় অন্তবর্তীকালীন সরকার কোনোভাবেই ৬ মাস থেকে ১ বছরের বেশি সময়ের জন্য থাকা উচিত হবে না। তার মধ্যেই একটা গ্রহণযোগ্য, স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে জনগনের নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করাটা অতীব জরুরি।


কেউ কেউ বলছেন, এখন নির্বাচন হলে তো বিএনপিই ক্ষমতায় আসবে। আমরা আওয়ামিলীগও চাই না, বিএনপিও চাই না, জামায়াতও চাই না। সবাই এক।


মাফ করবেন। আপনাদের আবেগটা বুঝি এবং সেই সাথে রাজনৈতিক অপরিপক্কতাও বুঝতে পারি। ১৫ বছরে নিজের সফট পাওয়ার কাজে লাগিয়ে শেখ হাসিনা অনেকগুলো বয়ান তৈরি করেছে। ‘শেখ হাসিনার বিকল্প কে?’ ‘জ্বলন্ত উনুন থেকে ফুটন্ত কড়াই’ ইত্যাদি। এই যে আপনারা বিএনপি, জামায়াত, আওয়ামিলীগ কাউকেই না চাওয়ার বাহানা করছেন, এটা মূলত আওয়ামিলীগের সেই বয়ানেরই অংশ। এবং স্যরি টু সে—এটাই আসলে ফ্যাসিবাদ। আপনারা এক ফ্যাসিস্টকে সরিয়ে, নিজেরা ফ্যাসিস্ট হয়ে উঠছেন।


ক্ষমতায় কে আসবে সেটা ঠিক করে দেবে জনগন। সেজন্য একটা ফ্রি এবং ফেয়ার ইলেকশানের কথাই আমাদের ভাবতে হবে। আপনি যদি মনে করেন যে স্বচ্ছ নির্বাচন হলে বিএনপি বা জামায়াত ক্ষমতায় চলে আসবে, তাই নির্বাচনে যাওয়াই উচিত না, তাহলে তো বলতেই হয়—এক ফ্যাসিজম দূর করে, আরেকটা ফ্যাসিজমে ঢুকে পড়ার কথাই আপনারা বলতেছেন।


দেখুন, জাতীয় রাজনীতিতে নতুনত্ব আসুক সেটা আমরা সকলে চাই। তবে, সেই নেতৃত্ব রাতারাতি তৈরি হবে না। সেটা একটা দীর্ঘ প্রচেষ্টার বিষয়। সেই নেতৃত্ব তৈরি করার জন্য দরকার রাজনীতি চর্চার সুষ্ঠু পরিবেশ যেখানে আপনি নিজের চিন্তা নিয়ে বিকশিত হতে পারবেন। নিজের মত প্রকাশ, দল বা সংগঠন করার অপরাধে আপনাকে গুম হতে হবে না, জেল খাটতে হবে না, ঘরবাড়ি ছাড়া হতে হবে না। সেই স্বাধীনতা নিশ্চিতকল্পে আপনারা কথা বলেন। কিন্তু মানুষের ভোটের অধিকার কুক্ষিগত রেখে যদি আপনারা রাজনীতি আর দেশের রিফর্মেশনের কথা ভাবেন, নিশ্চিতভাবেই বলতে পারি—একটা অনন্ত গৃহযুদ্ধ তো লাগবেই, যে স্বৈরাচার দূর করেছেন তা আবার ঘাঁড়ে এসে বসার সম্ভাবনা থাকবে সবচেয়ে বেশি।


বিএনপি আর জামায়াত কেউ দুধে ধোঁয়া তুলসি পাতা নয় মানছি। রাজনীতি ফেরেশতারা এসে করে না। আমাদেরকে নিশ্চিত করতে হবে ক্ষমতা পেয়ে বিএনপি আর জামায়াত (বা অন্য যেকোনো দল) যেন আওয়ামিলীগ ২.০ না  হয়ে উঠে। সেটার জন্য যা যা নাগরিক দায়িত্ব পালন করা উচিত, যা যা দাবি, প্রস্তাব পেশ করা উচিত তা করাই হলো বুদ্ধিমানের কাজ।


কেউ কেউ বলছেন, যে ছাত্ররা স্বৈরাচার তাড়িয়েছে, তারাই দেশ চালাক। আমরা তাদের নেতৃত্ব মেনে নেবো।


সত্যি কথা বলতে, ৫ ই আগষ্টের পরে এরচেয়ে রোমান্টিক কথা আর শুনি নাই।


প্রথমত ছাত্ররা স্বৈরাচার তাড়িয়েছে এই বয়ানটাই মোটাদাগে ভুল। স্বৈরাচার তাড়িয়েছে এই দেশের আপামর জনতা। ছাত্র, শিক্ষক, কৃষক, শ্রমিক, কুলি, মজুর, গৃহিনী সহ সকলে। আওয়ামিলীগ যেমন ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সকল অবদানের জন্য শেখ মুজিব ব্যতীত আর কারো কথা স্বীকার করতে চায় না, আপনারাও ২৪ এর আন্দোলনের সমস্ত ক্রেডিট ছাত্রদের দিয়ে একটা রোমান্টিসিজম তৈরি করতেছেন।


ক্ষেপে যাবেন না। একটু মনোযোগ দিয়ে পড়ুন।


এই কোটা আন্দোলন কি আসলেই স্বৈরাচার তাড়ানোর আন্দোলন ছিলো? ছাত্ররা কি নিজেরাও জানতো এই আন্দোলন স্বৈরাচার তাড়ানোর আন্দোলনের দিকে মোড় নিবে? আন্দোলনটা ছিলো স্রেফ কোটা সংস্কার। কিন্তু শেখ হাসিনার গোয়ার্তুমি আর একের পর এক ভুল সিদ্ধান্তে এই আন্দোলন তার পতনের আন্দোলনে রূপ নেয়।


এই আন্দোলন যতোদিন ক্যাম্পাসে আবদ্ধ ছিলো, ততোদিন পর্যন্ত এটা ছাত্রদের আন্দোলন ছিলো। কোটা সংস্কার আন্দোলন ছিলো। সেটা ১৮ ই জুলাই পর্যন্ত। কিন্তু যখনই ক্যাম্পাস বন্ধ করে, হলগুলোতে তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়, সেদিনই এই আন্দোলন গোটা দেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং এই আন্দোলন হয়ে উঠে ছাত্র জনতার আন্দোলন। সেটা তখন আর শুধু ‘ছাত্র’ আন্দোলন থাকেনি।


আওয়ামিলীগ যখন কমপ্লিট ইন্টারনেট শাট ডাউন করে দিয়ে ম্যাসাকার চালিয়েছিলো, বাড়ি বাড়ি রেইড দিয়েছিলো রাতগুলোতে, ওই ইন্টারনেটবিহীন সময়টায় রাস্তায় কারা নেমেছিলো সেই ঘটনা আপনারা জানেন? কারা তখনও আন্দোলনটাকে টেনে নিয়ে গিয়েছিলো? পুলিশের সাথে রাস্তায় পাল্টা লড়াই জারি রেখেছিলো?


যেহেতু ইন্টারনেট ছিলো না, তাই আমরা অধিকাংশই জানি না সেই ঘটনা। এই পুরো এক সপ্তাহ রাস্তার আন্দোলনটাকে জিইয়ে রেখেছিলো শ্রমিক শ্রেণীর মানুষগুলো। ছাত্ররা যখন ঘরে ঘুমোতে পারছে না, পালিয়ে বেড়াচ্ছিলো এখান থেকে সেখানে, শ্রমিক, মজুরেরা তখন এই আন্দোলনকে চাঙা রেখেছে। কারণ তারাও এই স্বৈরাচার দ্বারা নির্যাতিত, নিষ্পেষিত ছিলো। তারাও এই আন্দোলনে খুঁজে পাচ্ছিলো মুক্তির দিশা। আর জানেন তো—মুক্তির বার্তাটা সবার আগে শ্রমিক শ্রেণীর লোকেরাই টের পায়।


এক সপ্তাহের কমপ্লিট শাট ডাউনের পরে যখন ইন্টারনেট আসলো, আমরা দেখতে পেলাম এতো ম্যাসাকার আর নৈরাজ্যের পরেও আওয়ামিলীগ ব্যাকফুটেই আছে। আন্দোলন ফুরিয়ে যায়নি, জিইয়ে আছে। ব্যস, ছাত্ররা এসে হাল ধরলো আর আন্দোলন আরো গতি পেলো। কিন্তু মাঝখানের এই যে জন মানুষের অবদান, সেই অবদানকে কেনো আমরা ভুলে যেতে চাচ্ছি? সেটার কোনো ছবি, ভিডিও নেই বলে? সেটা অ্যাস্থেটিক নয় বলে? সেটা নিয়ে রোমান্টিসিজম করা যায় না বলে? এতোটা নিমকহারাম আমরা না হই আল্লাহর ওয়াস্তে।


কেউ কেউ তো বলছেন, রাজনৈতিক দলগুলো ১৫ বছরে স্বৈরাচার তাড়াতে পারেনি, ছাত্ররা ১৫ দিনে স্বৈরাচার তাড়িয়েছে। সুতরাং ছাত্ররা যা চাইবে তা-ই হবে।


ভাইয়েরা, আবু সাঈদ যেদিন নিহত হয়, ঠিক ওই দিনই চট্টগ্রামের ওয়াসিমও নিহত হয়। ওয়াসিমের পরিচয় কী জানেন? সে চট্টগ্রাম কলেজের ছাত্রদল করতো। শিবির করতো এমন কয়েকজন নিহত হয়েছে এই আন্দোলনে। আপনারা যারা বলছেন এই আন্দোলনে শুধু ‘ছাত্র’ দের পার্টিসিপেশান ছিলো, আর কেউ আসেনি, তাদের জন্যেই এই কথাগুলো বলা।


এই আন্দোলনে বিএনপি ছিলো, জামায়াত ছিলো, বাম দলগুলো ছিলো, ডান দলগুলো ছিলো। হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান-উপজাতি—সকলে ছিলো। সকলে ছিলো ঠিক, কিন্তু কোনো ব্যানার ছিলো না। ব্যানার ছিলো একটাই—‘ছাত্র নাগরিক অভ্যুত্থান’। ব্যানার না থাকাতেই এই আন্দোলন সরকার দমন করে কূলিয়ে উঠতে পারেনি। যারা ভাবতেছেন শুধু পাবলিক আর প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা একাই এই স্বৈরাচার তাড়িয়েছে তারা একটা ডিনায়ালে আছেন। সেই ডিনায়ালের অন্যতম কারণ—আপনাদের মাথায় আগে থেকেই শেখ হাসিনার বয়ান সেট করা আছে—‘জ্বলন্ত উনুন থেকে ফুটন্ত কড়াই’।


এই আন্দোলনের সমন্বয়কদের রাজনীতি করতে দেন। কিন্তু এখনই তাদের হাতে দেশ চালনার দায়িত্ব তুলে দেওয়ার মতো বোকামি করবেন না দয়া করে। মনে রাখবেন—এই আন্দোলন স্বৈরাচার তাড়ানোর আন্দোলনে রূপ নিয়েছে সর্বোতভাবে আল্লাহর দয়ায়। ছাত্ররা এই উদ্দেশ্যে এই আন্দোলন শুরু করেনি। সবকিছু একটা মিরাকলের মতো ঘটেছে। এই মিরাকলের কথা ভুলে গিয়ে, সমন্বয়কদেরকে জোর করে যদি ক্ষমতায় বসিয়ে দেন, সেটা তাদের জন্য যেমন ক্ষতির হবে, দেশের জন্যেও একটা বিশাল ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। দেশ চালানো আর একটা মিরাকলাস আন্দোলনের মুখপাত্র হওয়া এক জিনিস নয়।

যাহোক, আজ এই পর্যন্তই...

Previous Post Next Post

Contact Form